মন্ডল পরিবারের আর্কাইভ রিপোর্ট
Admin Dashboard
⭐ Star Rating Control (Card + Total)
🎯 Home Page Banner Control
Master Control (Reset & Report)
Schedule & Media
Check-In Control
Check-Out Control
🔄 Batch Check-In System (Race Condition Fix)
Star Notification
Notice Board
🔒 Comment Lock Control
ON করলে মেম্বার Check-In ও Check-Out-এ এই নম্বরটি ফোর্স করা হবে📤 Share Target Control
Sub-Admin Access
🔴 মন্ডল পরিবার 🔴
💓 মন্ডল পরিবারের লাইভ সেশন 💓
আগামী লাইভে আবার চেষ্টা করুন।
আর নতুন সদস্য চেক-ইন করতে পারবেন না।
মোট কমেন্ট লিমিটে পৌঁছে গেছে।
আমাদের গ্রামের বাড়ি — পাঁচ প্রজন্মের স্মৃতি ও গল্প
Mondal Poribar-এর পারিবারিক ইতিহাস ও সেই পুরনো দিনের কথা
📖 ভূমিকা — কেন এই লেখা?
আসলে এই লেখাটা লিখতে বসেছি অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম। কিন্তু সময় পাচ্ছিলাম না। আজকাল সবাই শহরে চলে গেছে, বড় বড় অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। কিন্তু আমার মনে হয় যে একটা পরিবারের গল্প, একটা বাড়ির ইতিহাস — এটা হারিয়ে গেলে চলবে না। তাই ভাবলাম লিখে রাখি।
আমাদের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের একটা ছোট্ট গ্রামে। নাম বলব না এখানে, কিন্তু যারা ওই এলাকার তারা চিনবেন। Mondal Poribar-এর এই বাড়িটা প্রায় ১২০ বছরের পুরনো। হ্যাঁ, একশো বিশ বছর। শুনতে অবাক লাগে, তাই না? কিন্তু এটা সত্যি।
আমাদের গ্রামের বাড়ির একটা কল্পচিত্র — কাগজ-কলমে আঁকা স্মৃতি
আমি যখন ছোট ছিলাম, দাদু বলতেন যে এই বাড়িটা তাঁর দাদাই বানিয়েছিলেন। তখন কোনো সিমেন্ট ছিল না, কোনো রড ছিল না। পুরোটাই মাটি, বাঁশ, আর কাঠ দিয়ে। কিন্তু সেই বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে। ভাবতে পারো?
তো এই লেখায় আমি আমাদের পরিবারের পাঁচ প্রজন্মের গল্প তুলে ধরব। কেউ হয়তো বলবে এসব পড়ে কী হবে? কিন্তু আমার মনে হয়, একটা পরিবারের ইতিহাস জানা দরকার। নাহলে আমরা কোথা থেকে এসেছি, কীভাবে এখানে পৌঁছেছি — এসব জানব কী করে?
👴 প্রথম প্রজন্ম — দাদুর বাবার সময় (১৯০০-১৯৫০)
আমার পরদাদার নাম ছিল রামচন্দ্র মণ্ডল। তিনি ছিলেন একজন কৃষক। ওই সময়ে গ্রামে সবাই চাষবাস করত। কেউ শহরে যেত না। শহর মানেই ছিল অনেক দূরের একটা জায়গা।
পরদাদা বলতেন, তাঁর বাবার সময়ে এই জমিটা কিনেছিলেন একটা ছোট্ট টাকায়। তখন জমির দাম ছিল প্রায় কিছুই না। এক বিঘা জমি পাওয়া যেত কয়েক টাকায়। কিন্তু সেই জমি কিনেই শুরু হয়েছিল আমাদের পরিবারের গল্প।
সেই সময়ের জীবনযাত্রা
১৯০০ সালের দিকে গ্রামের জীবন একদম আলাদা ছিল। বিদ্যুৎ ছিল না। রাতে কুপি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করত। আমার পরদাদা তিন ক্লাস পড়েছিলেন। সেই সময়ে তিন ক্লাস পড়া মানেই অনেক বড় কথা।
খাবারের কথা যদি বলি, তাহলে বলতে হবে যে সব কিছুই ছিল নিজস্ব। ধান নিজের জমিতে, সবজি নিজের বাগানে, দুধ নিজের গরু থেকে। বাজারে কিছু কিনতে হতো না প্রায়। শুধু মাঝে মাঝে লবণ আর তেল কিনতে যেতে হতো।
আমাদের বাড়ির সামনে যে বড় আমগাছটা আছে, সেটা আমার পরদাদা লাগিয়েছিলেন ১৯২৩ সালে। মানে সেই গাছটার বয়স এখন ১০৩ বছরের বেশি! আজও প্রতি বছর আম পাড়া হয়।
বিয়ের কথা যদি বলি, তাহলে বলতে হয় যে সেই সময়ে বিয়ে হতো অনেক কম বয়সে। আমার পরদাদার বিয়ে হয়েছিল ১৬ বছর বয়সে। বউ এসেছিলেন পাশের গ্রাম থেকে। নাম ছিল সরস্বতী দেবী। আমি তাঁর ছবি দেখেছি — একটা কালো-সাদো ছবি। মুখে অনেক শান্তি ছিল।
সেই সময়ে আমাদের বাড়িতে ছিল পাঁচটি ঘর। একটা ছিল রান্নাঘর, একটা ছিল ঘুমানোর ঘর, একটা ছিল গোয়ালঘর, আর দুটো ছিল খড়ের গুদাম। পুরো বাড়িটা ছিল মাটির। ছাদ ছিল খড়ের। বর্ষাকালে ছাদ ঠিকমতো না বাঁধলে ভেতরে জল পড়ত।
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সেই সময়ে মানুষের মধ্যে একটা ভাইবোনের সম্পর্ক ছিল যা আজকাল দেখা যায় না। প্রতিবেশীরা সবাই একসাথে থাকত। কারো বিপদ হলে সবাই ছুটে আসত। এটা আজকাল শহরে সম্ভব না।
👴 দ্বিতীয় প্রজন্ম — দাদুর যুগ (১৯৫০-১৯৮০)
দাদুর নাম ছিল গোপাল চন্দ্র মণ্ডল। তিনি ছিলেন পরদাদার বড় ছেলে। তাঁর সময়ে অনেক কিছু বদলেছিল। দেশ স্বাধীন হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। দাদুর বয়স তখন মাত্র ১২ বছর।
দাদু একটু পড়াশোনা করেছিলেন। ম্যাট্রিক পাস করেছিলেন। সেই সময়ে গ্রামে ম্যাট্রিক পাস করা মানেই বড় লোক। সবাই সম্মান করত। দাদু প্রথমবারের মতো আমাদের পরিবারে চাকরি করেছিলেন — পোস্ট অফিসে একটা ছোট চাকরি।
দাদু ম্যাট্রিক পাস করলেন। গ্রামে প্রথম ম্যাট্রিক পাস। সবাই মিষ্টি খাইয়ে উৎসব করলেন।
পোস্ট অফিসে চাকরি শুরু। মাসিক বেতন ছিল ৪৫ টাকা। সেই টাকায় সংসার চলত।
দাদুর বিয়ে। বউ এলেন দূরের একটা গ্রাম থেকে। নাম ছিল মনোরমা দেবী।
আমাদের পুরনো বাড়িটা মেরামত করা হলো। প্রথমবার টিনের ছাদ হলো।
বাবা জন্মালেন। পরিবারে প্রথম ছেলে। সবাই খুব খুশি হলেন।
দাদুর সময়টা ছিল একটা ট্রানজিশন পিরিয়ড। পুরনো আর নতুনের মাঝামাঝি। একদিকে ছিল গ্রামের পুরনো রীতি, অন্যদিকে আসছিল নতুন জিনিস। প্রথমবার রেডিও এলো আমাদের বাড়িতে। সবাই মিলে রেডিও শুনত। তখন আকাশবাণী চলত।
দাদুর গল্পগুলো
আমি ছোটবেলায় দাদুর কাছে বসে অনেক গল্প শুনেছি। তিনি বলতেন ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের কথা। তখন তিনি খুব ছোট ছিলেন, কিন্তু মনে আছে যে মানুষের কষ্ট দেখেছেন। অনেক মানুষ অনাহারে মরেছিল।
আর একটা গল্প বলতেন ১৯৭১ সালের যুদ্ধের। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের গ্রামে অনেক শরণার্থী এসেছিল। দাদু বলতেন যে তাঁরা রাতে লুকিয়ে খাবার দিতেন। কারণ দিনের বেলায় পাকিস্তানি সেনারা ঘুরত।
দাদু ছিলেন খুব মিষ্টি মানুষ। কখনো কাউকে রাগ দেখাতেন না। সব সময় হাসিমুখে থাকতেন। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন দাদু আমাকে কোলে নিয়ে গল্প বলতেন। সেই স্মৃতিগুলো আজও মনে আছে।
দাদু ১৯৮৫ সালে মারা যান। হার্ট অ্যাটাকে। তখন আমার বয়স মাত্র ৩ বছর। তাই দাদুকে আমি সেভাবে মনে রাখতে পারি না। কিন্তু বাবা আর ঠাকুমার কাছে যে গল্প শুনেছি, তাতে দাদুকে একদম চেনা মানুষ মনে হয়।
👨 তৃতীয় প্রজন্ম — বাবার বয়স (১৯৮০-২০১০)
বাবার নাম সুধীর চন্দ্র মণ্ডল। বাবা ছিলেন দাদুর বড় ছেলে। বাবার সময়টা ছিল আমাদের পরিবারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাবাই প্রথমবারের মতো শহরে গিয়ে পড়াশোনা করলেন।
বাবা বলতেন, তাঁর বয়স যখন ১৮, তখন দাদু তাঁকে কলকাতায় পাঠালেন পড়াশোনা করতে। সেই সময়ে গ্রাম থেকে কলকাতা যাওয়া মানেই অনেক বড় ব্যাপার। ট্রেনে করে যেতে হতো পাঁচ ঘণ্টা।
বাবা কলকাতায় থাকতেন একটা মেসে। মাসিক ভাড়া ছিল ৩০ টাকা। খাবার আর থাকার খরচ মিলিয়ে মাসে ১০০ টাকা লাগত। দাদু পোস্ট অফিসের চাকরি থেকে মাসে ২০০ টাকা পেতেন। তার মধ্যে ১০০ টাকা বাবার জন্য পাঠাতেন।
বাবার সংগ্রাম
বাবা বি.কম পাস করলেন ১৯৮৫ সালে। তারপর একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি পেলেন। শুরুর বেতন ছিল ৮০০ টাকা। সেই টাকায় বাবা নিজেও থাকতেন আর বাড়িতেও পাঠাতেন।
আমি বাবার কাছে শুনেছি, কলকাতায় থাকার সময় তিনি রাতে টিউশনি পড়াতেন। দিনে কলেজ, সন্ধ্যায় চাকরি, রাতে টিউশনি। এভাবেই চলত। বাবা বলতেন, "আমি কখনোই মনে করিনি যে আমি কষ্ট করছি। কারণ মনে হতো যে আমার পরিবারের জন্য করছি।"
- বাবা ১৯৮৮ সালে বিয়ে করলেন। মা এলেন কলকাতার একটা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে।
- ১৯৯০ সালে আমাদের পুরনো বাড়িটায় প্রথমবার সিমেন্টের কাজ হলো। দেয়াল পাকা হলো।
- ১৯৯২ সালে বাবা একটা নতুন চাকরি পেলেন। বেতন বেড়ে হলো ৩,০০০ টাকা।
- ১৯৯৫ সালে আমি জন্মালাম। পরিবারে নতুন আনন্দ।
- ২০০০ সালে বাবা প্রথমবার মোটরসাইকেল কিনলেন। হিরো হোন্ডা। সেই বাইক এখনো আছে।
- ২০০৫ সালে বাড়িতে প্রথমবার টিভি আসলো। কালার টিভি। সবাই মিলে দেখতাম।
বাবার সময়ে আমাদের পরিবার অনেকটাই বদলে গেল। আগে ছিল কেবল কৃষি নির্ভর। এখন চাকরি আর ব্যবসাও হলো। বাবার একটা ছোট ব্যবসা শুরু করলেন ২০০২ সালে। কিছুটা সফলও হলেন।
২০০৮ সালে বাবা আমাদের পুরনো বাড়িটা একদম নতুন করে বানালেন। পুরনো মাটির বাড়ি ভেঙে নতুন পাকা বাড়ি হলো। সেই দিন গ্রামের সবাই এসেছিল। তিন দিন ধরে খাওয়া-দাওয়া চলেছিল।
বাবা এখনো বলেন যে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো আমাদের ভাইবোনদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। বাবা মনে করেন, টাকা-পয়সা ফুরিয়ে যায়, কিন্তু শিক্ষা আর মূল্যবোধ থেকে যায়।
👨💼 চতুর্থ প্রজন্ম — আমাদের সময় (২০১০-বর্তমান)
আমরা হলাম চতুর্থ প্রজন্ম। আমার নাম সৌম্য মণ্ডল। আমি বাবার বড় ছেলে। আমার একটা ছোট বোনও আছে। নাম সোনালী।
আমাদের সময়টা একদম অন্যরকম। আমরা ইন্টারনেটের যুগে বড় হয়েছি। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট — এসব আমাদের জীবনের অংশ। কিন্তু আমি মনে করি, পুরনো দিনের যে মূল্যবোধ, সেটা এখনো ধরে রাখা দরকার।
আমার শৈশব
আমার শৈশব কেটেছে গ্রামেই। যদিও বাবা শহরে চাকরি করতেন, কিন্তু আমাদের পড়াশোনার শুরুটা হয়েছিল গ্রামের স্কুলেই। আমাদের গ্রামের স্কুলটার নাম ছিল মণ্ডলহাট প্রাইমারি স্কুল।
সেই স্কুলে পড়ার সময় কতো কিছু মনে পড়ে! সকালে উঠে স্কুলে যাওয়া, দুপুরে বাড়ি ফিরে মায়ের হাতের খাবার, বিকেলে বন্ধুদের সাথে খেলা। সেই সময়টা ছিল সোনার সময়।
আমি মাধ্যমিক পাস করলাম ২০১০ সালে। তারপর উচ্চমাধ্যমিক, তারপর কলেজ। কলেজ শেষ করে আমি একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি পেলাম। কিন্তু মনে হতো যে কিছু একটা করতে হবে নিজের জন্য। তাই ভাবলাম ওয়েবসাইট বানাবো।
আমার ছোট বোন সোনালী
আমার বোন সোনালী এখন বিবিএ পড়ছে। সে অনেক মেধাবী। বাবা-মা খুব গর্বিত ওর জন্য। সোনালী বলে যে সে একদিন বড় আইএএস অফিসার হবে। আমি জানি যে সে পারবে। কারণ আমাদের পরিবারে সংগ্রাম করতে শেখা হয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
আমাদের প্রজন্মের একটা বিশেষত্ব হলো, আমরা পুরনো আর নতুনের মিশেল। একদিকে আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করি, অন্যদিকে গ্রামের পুরনো রীতি মেনে চলি। পয়লা বৈশাখে আমরা গ্রামেই থাকি। দুর্গাপুজোয় সবাই মিলে আসি।
👶 পঞ্চম প্রজন্ম — নতুন প্রজন্ম
পঞ্চম প্রজন্ম এখনো ছোট। আমার বড় চাচাতো ভাইয়ের একটা ছেলে আছে। নাম রাহুল। বয়স মাত্র ৮ বছর। কিন্তু সে যে কী দ্রুত শিখছে, তা দেখে অবাক হই।
রাহুল এখনো ট্যাবলেটে গেম খেলে, ইউটিউবে কার্টুন দেখে। কিন্তু আমি দেখেছি যে যখন ওকে আমাদের পুরনো বাড়ির গল্প বলি, তখন ও খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে। ও বলে, "দাদা, আমি বড় হয়ে সেই বাড়িটা ঠিক করে দেবো।"
আমার মনে হয়, এই ছোট ছোট কথাগুলোর মধ্যেই আমাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে। নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে যে তারা কোথা থেকে এসেছে। তাহলেই তারা বুঝতে পারবে যে কোথায় যেতে হবে।
নতুন প্রজন্মের চোখে আমাদের গ্রামের বাড়ি — একদিন এটাই আবার নতুন হয়ে উঠবে
আমি চাই যে রাহুল আর ওর প্রজন্ম যেন গ্রামের মাটির সাথে যুক্ত থাকে। শহরে থাকলেও যেন মনে রাখে যে তাদের একটা গ্রাম আছে, একটা বাড়ি আছে, একটা পরিবারের ইতিহাস আছে।
🖼 সেই পুরনো স্মৃতিগুলো
এখন কিছু পুরনো স্মৃতির কথা বলি যা আমার মনে আজও তাজা। হয়তো তোমরা অনেকেরই মনে পড়বে তোমাদের নিজেদের স্মৃতি।
বর্ষার দিনগুলো
বর্ষাকালে আমাদের বাড়ির সামনের পুকুরটা ভরে যেত। আর আমরা ছোটরা সেখানে সাঁতার কাটতাম। মা বারবার বলতেন, "ভেতরে যেও না, পানি বেশি গভীর।" কিন্তু কে শোনে? আমরা তো ছোট ছিলাম!
বৃষ্টি হলে ছাদে বসে বৃষ্টি দেখতাম। টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ — এটা এখনো মনে পড়লে শান্তি লাগে। শহরে এতো শব্দ যে বৃষ্টির শব্দ শোনা যায় না। কিন্তু গ্রামে রাতের বেলা টিনের ছাদে বৃষ্টি পড়লে যে শব্দ হয়, তার কোনো তুলনা হয় না।
শীতের রাত
শীতের রাতে আগুন জ্বলত উঠোনে। সবাই মিলে বসতাম। দাদু আগুনের পাশে বসে গল্প বলতেন। আমরা ছোটরা শুনতাম। কখনো ভূতের গল্প, কখনো দেশভাগের গল্প, কখনো আবার মজার ঘটনা।
শীতে মা পিঠে বানাতেন। নলেন গুড়ের পিঠে, পাটিসাপটা, চিতই পিঠে — এসবের গন্ধ এখনো নাকে লাগে। শহরে এসব পাওয়া যায়, কিন্তু সেই স্বাদ আর পাওয়া যায় না। কারণ মায়ের হাতের স্পর্শ ছাড়া খাবারের স্বাদ আলাদা হয় না।
দুর্গাপুজো
দুর্গাপুজো মানেই ছুটি, নতুন জামা, আর আনন্দ। আমাদের গ্রামে দুর্গাপুজো হতো খুব জাঁকজমক করে। পাঁচ দিন ধরে চলত। সন্ধ্যায় লোকনাট্য, যাত্রা, আর কবিগান।
আমি মনে করি আমাদের গ্রামের দুর্গাপুজোর সবচেয়ে ভালো লাগত অষ্টমীর রাতে। সবাই মিলে পandal ঘুরতে যেতাম। মিষ্টি কিনতাম। আর রাতে বাড়ি ফিরে মায়ের হাতের খিচুড়ি খেতাম। সেই স্বাদ!
পুরনো বই আর খাতা
আমাদের বাড়িতে একটা আলমারি আছে যেখানে পুরনো বই, খাতা, আর চিঠি রাখা। একদিন সেই আলমারি খুলে দেখলাম পরদাদার হাতে লেখা একটা খাতা। তাতে জমির হিসাব লেখা। কতো টাকা খরচ, কতো টাকা আয় — সব।
আর পেলাম দাদুর একটা চিঠি। ১৯৬০ সালের। দাদু তাঁর এক বন্ধুকে চিঠি লিখেছিলেন। কাগজটা এতো পুরনো যে হাতে নিতেই ভয় লাগছিল। কিন্তু সেই চিঠি পড়ে মনে হলো যে সময় বদলেছে, কিন্তু মানুষের মন বদলায়নি। একই আবেগ, একই ভালোবাসা।
🌱 গ্রামের জীবনযাত্রার পরিবর্তন
আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আর এখনকার গ্রামের মধ্যে অনেক পার্থক্য। কিছু ভালো হয়েছে, কিছু খারাপ। দুটোর কথাই বলি।
যা ভালো হয়েছে
- রাস্তা হয়েছে পাকা। আগে কাঁচা রাস্তা ছিল, বর্ষায় কাদায় ভরে যেত।
- বিদ্যুৎ এসেছে প্রতিটি ঘরে। আগে কুপি জ্বালিয়ে রাত কাটাতে হতো।
- মোবাইল ফোন এসেছে। এখন যোগাযোগ সহজ।
- স্কুলে ভালো শিক্ষক এসেছেন। ছেলেমেয়েরা এখন ভালো পড়াশোনা করছে।
- স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়েছে। ছোটখাটো অসুখের জন্য শহরে যেতে হয় না।
যা হারিয়ে গেছে
- প্রতিবেশীদের মধ্যে যে ভাইবোনের সম্পর্ক ছিল, তা এখন কমে গেছে।
- পুরনো খেলাগুলো হারিয়ে গেছে। এখন সবাই মোবাইলে গেম খেলে।
- নদীর জল পরিষ্কার ছিল এক সময়। এখন দূষিত হয়ে গেছে।
- গাছপালা কমে গেছে। অনেক জমি বিক্রি হয়ে গেছে।
- পুরনো দিনের মেলা, যাত্রা, লোকনাট্য — এসব এখন কমে গেছে।
আমি মনে করি, উন্নতি দরকার। কিন্তু সেই সাথে পুরনো ভালো জিনিসগুলো ধরে রাখাও দরকার। আমরা যেন এমনভাবে এগিয়ে চলি যে আমাদের শিকড় যেন হারিয়ে না যায়।
আমি চাই আমাদের গ্রামে একটা ছোট লাইব্রেরি বানাতে। যেখানে পুরনো বই, ইতিহাস, আর গল্পের বই থাকবে। যাতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারে তাদের অতীত। এটা আমার স্বপ্ন।
✍ শেষ কথা
এতোক্ষণ ধরে আমাদের পরিবারের গল্প পড়লে। হয়তো কিছু জায়গায় বিরক্ত লেগেছে, কিছু জায়গায় ভালো লেগেছে। কিন্তু আমি যা বলতে চেয়েছি তা হলো — প্রতিটা পরিবারের একটা গল্প থাকে। সেই গল্পটা জানা দরকার।
Mondal Poribar-এর এই গল্পটা শুধু আমাদের নয়। এটা বাংলার হাজারো পরিবারের গল্প। যারা সংগ্রাম করেছে, যারা কষ্ট করেছে, যারা নতুন প্রজন্মের জন্য পথ তৈরি করেছে।
আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। কিন্তু একটা জিনিস জানি যে আমাদের বাড়িটা, আমাদের গ্রামটি, আর আমাদের পরিবারের এই ইতিহাস — এটা চিরকাল থেকে যাবে। হয়তো একদিন রাহুল ওর ছেলেকে এই গল্প বলবে। আর সেই ছেলে আবার ওর ছেলেকে বলবে। এভাবেই চলতে থাকবে।
তোমাদের কেউ যদি এতোদূর পড়ে থাকো, তাহলে তোমাদের ধন্যবাদ। আর তোমাদের কাছে অনুরোধ — তোমাদের পরিবারের গল্পটাও লিখে রাখো। কাগজে, কম্পিউটারে, যেখানেই হোক। কারণ এই গল্পগুলোই আমাদের পরিচয়।
শেষ করছি দাদুর একটা কথা দিয়ে — "মাটির সাথে যে যুক্ত থাকে, সে কখনো হারায় না। কারণ মাটিই আমাদের মা।"
— সৌম্য মণ্ডল
১০ আগস্ট, ২০২৬

